৯৭.৬ শতাংশ বেজলাইন প্রস্তুত

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি পরিমাপের ২৪৮টি সূচকের মধ্যে ২৪২টির বেজলাইন বা প্রাথমিক ভিত্তি-উপাত্ত প্রস্তুত হয়েছে। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যে এ হার ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বাকি ছয়টি সূচকের তথ্য এখনও প্রস্তুত হয়নি। এসব তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বেজলাইন না থাকা ছয়টি সূচক হলোÑ অভিবাসন নীতি, নগর পরিকল্পনায় নাগরিক অংশগ্রহণ, খাদ্যক্ষতি ও অপচয়, সামুদ্রিক পানির অম্লতা, সামুদ্রিক প্রযুক্তি গবেষণায় অর্থায়ন এবং অবৈধ আর্থিক প্রবাহ। পাশাপাশি বিদ্যমান উপাত্ত হালনাগাদ ও নির্ধারিত সময়ে এসডিজি ট্র্যাকারে তথ্য প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্মেলন কক্ষে জাতীয় উপাত্ত সমন্বয় কমিটির (এনডিসিসি) সভায় এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। সভায় এসডিজি সূচকের তথ্যপ্রাপ্যতা, আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে উপাত্ত বিনিময় নিয়ে আলোচনা হয়। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুল আওয়াল। পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক ও উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ মিয়া। সভায় ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও আইবিএর প্রতিনিধিরাও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সভায় উপাত্ত বিনিময় জোরদার, কারিগরি কমিটির কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং নির্ধারিত সময়ে তথ্য সরবরাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। বিশেষ করে বাকি ছয়টি সূচকের বেজলাইন প্রস্তুত, পুরনো উপাত্ত হালনাগাদ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়াতে হবে”।

এক সভার ব্যবধানে অগ্রগতি

সভাসূত্রে জানা গেছে, আগে এসডিজি সূচকের উপাত্তের প্রাপ্যতা ছিল ৯৫ শতাংশ। হালনাগাদ তথ্যে তা বেড়ে ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। প্রাথমিক উপাত্ত তৈরির পরও নির্দিষ্ট সময় অন্তর তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করতে হয়। তা না হলে উন্নয়নের অগ্রগতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। সভায় কয়েকটি সূচকের পুরনো তথ্য এবং নির্ধারিত সময়ে এসডিজি ট্র্যাকারে তথ্য প্রকাশ না হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তাই বাকি সূচকগুলোর বেজলাইন তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান উপাত্ত নিয়মিত হালনাগাদ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ছয় সূচকে তথ্যের ঘাটতি

সভায় বেজলাইন না থাকা ছয়টি সূচকের তথ্যের উৎস ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে কয়েকটি সূচকের তথ্য প্রকাশে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। অভিবাসন নীতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সূচক ১০.৭.২-এর দায়িত্ব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। এক মাসের মধ্যে এসডিজি ট্র্যাকারে তথ্য প্রকাশের আগের সিদ্ধান্তও বাস্তবায়িত হয়নি। নগর পরিকল্পনায় নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত সূচক ১১.৩.২-এর দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের। ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বেজলাইন প্রকাশের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা হয়নি। খাদ্যক্ষতি ও অপচয় পরিমাপের সূচক ১২.৩.১-এর তথ্যের উৎস বিবিএসের কৃষি উইং, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট এবং খাদ্য অধিদপ্তর। সামুদ্রিক পানির অম্লতা সংক্রান্ত সূচক ১৪.৩.১-এর দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। তবে এ সূচকের তথ্যও এখনও ট্র্যাকারে প্রকাশিত হয়নি। সামুদ্রিক প্রযুক্তি গবেষণায় বরাদ্দ সংক্রান্ত সূচক ১৪.এ.১-এর তথ্য দেবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগ। আর অবৈধ আর্থিক প্রবাহ সংক্রান্ত সূচক ১৬.৪.১-এর দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের।

সমন্বয়ের আওতায় ১১০ উপাত্তের উৎস

এসডিজি সূচকের তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ে যুক্ত রয়েছে ১৮টি মন্ত্রণালয়, ১০টি বিভাগ ও ৮২টি সংস্থা। মোট ১১০টি উপাত্তের উৎসের মধ্যে সমন্বয় করে কাজটি পরিচালনা করা হয়। এ কাজে এনডিসিসির অধীনে রয়েছে ৯টি বিষয়ভিত্তিক কারিগরি কমিটি। কমিটিগুলো তথ্যের ঘাটতি চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া এবং উপাত্ত প্রস্তুতির অগ্রগতি পর্যালোচনায় সহায়তা করে। সভায় আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। কয়েকটি সূচকের বেজলাইন এসডিজি ট্র্যাকারে প্রকাশিত হলেও খাদ্যক্ষতি, সামুদ্রিক পানির অম্লতা, সামুদ্রিক প্রযুক্তি গবেষণায় অর্থায়ন ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহের তথ্য প্রস্তুতে কাজ বাকি রয়েছে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে তথ্য প্রকাশ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজ নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়েও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ

জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত কারিগরি প্রকল্পের আওতায় আটটি বিভাগ এবং কক্সবাজার, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলায় ১১টি সেমিনার হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আরও পাঁচটি সেমিনারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় অগ্রাধিকার সূচকের তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসডিজি অর্জনের সময়সীমা ২০৩০ সাল। এ লক্ষ্য পূরণে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত সংগ্রহ, নিয়মিত হালনাগাদ ও জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করা জরুরি। ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ সূচকের বেজলাইন প্রস্তুত হওয়া অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে বাকি ছয়টি সূচকের তথ্য প্রস্তুত এবং বিদ্যমান উপাত্ত নিয়মিত হালনাগাদ না হলে উন্নয়নের প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।