দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানির অভাবে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গ্যাসের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ খাতের বাড়তি আর্থিক দায় শিল্প উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হয়ে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে একদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি খরচের চাপে পড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও উঁচু থাকছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের জ্বালানি খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত অনুসন্ধান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি রয়ে গেছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হচ্ছে।
গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা থেকে আমদানিনির্ভরতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রাকৃতিক গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত কমে যাওয়া এবং চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে হচ্ছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে।
এই নির্ভরতা দেশের জ্বালানি সরবরাহকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করেছে। ফলে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বা আমদানিতে সমস্যা দেখা দিলে দেশের সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আমদানি করা গ্যাস গ্রহণ ও সরবরাহের জন্য অল্প কয়েকটি স্থাপনার ওপর নির্ভরশীলতাও সংকট মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলছে।
এর একটি উদাহরণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ স্থাপনা (এফএসআরইউ)। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই স্থাপনায় কারিগরি ত্রুটি ও পরিচালনাগত বিঘ্নের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বেড়ে সংকট আরও তীব্র হয়। অর্থাৎ, আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করার সক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়নি।
সক্ষমতা বাড়লেও মিলছে না পর্যাপ্ত জ্বালানি
গত এক দশকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। এতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪৩ শতাংশ এসেছে বেসরকারি উৎপাদকদের কাছ থেকে।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেই যে বাস্তবে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তা নয়। পর্যাপ্ত গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ না থাকা এবং সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উৎপাদনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্থাপিত সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এর পাশাপাশি ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা এবং উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা সরকারের আর্থিক দায় বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও নীতিগত ব্যর্থতার কারণে গত এক দশকে জ্বালানি খাতের কাঠামোগত ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উন্নয়ন না হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, চাপে ব্যবসা
গ্যাসের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করেছে। কিছু কারখানাকে সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধও রাখতে হয়েছে।
গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং ও সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এর শিকার হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা কমাতে সরকার শপিং মল ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র আগেভাগে বন্ধ রাখার মতো জরুরি ব্যবস্থাও নিয়েছে। গৃহস্থালি ও পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। রান্নার গ্যাস সংগ্রহে ভোগান্তির পাশাপাশি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ ব্যবসার পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই পরিস্থিতি চললে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি সীমিত
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর চাপ বজায় রেখেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে গড় সার্বিক মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে মূল্যস্ফীতি আরও কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে আসায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির চাপ শেষ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। ফলে খাদ্যপণ্যের বাইরেও বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এই চাপ বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জ্বালানির দাম ১৫ থেকে ২১ শতাংশ বেড়েছিল। সেপ্টেম্বরে জ্বালানির দাম গড়ে আরও ১৫ শতাংশ বাড়ে। এসব মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়েছে। সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা এবং অর্থ সরবরাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধিও মূল্যস্ফীতির চাপ ধরে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
এর প্রভাব পড়েছে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বল্প মজুরির শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক ছিল। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে এই হার সাময়িকভাবে ইতিবাচক হলেও অর্থবছরের শেষ দিকে আবার ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টেও এ পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল।
সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, গভীর ও অগভীর সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, অতিরিক্ত এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে। দীর্ঘদিনের ঘাটতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা দ্রুত দূর করা সম্ভব নয় বলেও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে সংকট মোকাবিলায় স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা এবং খাতটির পরিচালনা ও জবাবদিহি উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে গড়ে তুলতে হবে বহুমুখী, নির্ভরযোগ্য ও আর্থিকভাবে টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও সরবরাহের বিঘ্ন মোকাবিলা করতে পারবে।
