স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ৬৮, বাড়ছে হতাহতের শঙ্কা

স্পেনের তোলেদো অঞ্চলের উর্দা স্টেশনের কাছে বুধবার সকালে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন।

এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮০ জন। তাদের মধ্যে ৫০ জনের অবস্থা গুরুতর। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এল পাইস (EL PAÍS) সরকারের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলোর আশঙ্কা, দুর্ঘটনাটি গত ১৮ জানুয়ারি কর্দোবার আদামুজে ঘটে যাওয়া রেল দুর্ঘটনার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন।

কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলের সরকার জানিয়েছে, আহত অন্তত ৫৫ জনকে আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

যেভাবে ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা

জরুরি সেবার সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ইরিও ট্রেনের সঙ্গে একটি আভে উচ্চগতির ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে দুটি বগি ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আভে ট্রেনটি পেছন থেকে ইরিও ট্রেনটিকে ধাক্কা দিয়ে থাকতে পারে। এতে ইরিও ট্রেনটির দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।

স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ, সিউদাদ রিয়াল ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর সরকার ও বিরোধী দল বুধবারের পূর্বনির্ধারিত সব কর্মসূচি বাতিল করেছে।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আমি পরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে এবং কাস্তিয়া-লা মানচার আঞ্চলিক সরকারের প্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন। এ কাজে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা, সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।

ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে দেশটির সাবেক পপুলার পার্টির শ্রমমন্ত্রী ফাতিমা বায়েনেজও ছিলেন। তবে দুর্ঘটনায় তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনও কিছু জানা যায়নি।

আন্দালুসিয়ার প্রেসিডেন্সিবিষয়ক আঞ্চলিক মন্ত্রী ও জরুরি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা আন্তোনিও সানজ বলেন, “বায়েনেজ সম্পর্কে আপনাদের এখনই কোনো তথ্য দিতে পারছি না। তবে তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তারা এরই মধ্যে ঘটনাস্থলের এলাকায় পৌঁছেছেন। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি।”

মানবিক ভুলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় রেল অবকাঠামো সংস্থা আদিফের একজন কর্মীর ভুলের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রধান সংকেতব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর সেটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীর ভুল সিদ্ধান্তই দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ।

নিরাপত্তাব্যবস্থাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। তবে এতে ত্রুটি দেখা দিলে তা ম্যানুয়াল বা মানবনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় চলে যায়।

প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় ট্রেনগুলো থেমে যায়। পরে মানুষের নিয়ন্ত্রণে ট্রেন চলাচল আবার শুরু করা হয়। আর সেই পর্যায়েই ভুলটি ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রেলওয়ে ইউনিয়নের মুখপাত্র রাফায়েল এসকুদেরো দুর্ঘটনাটিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অ্যানতেনা থ্রি রেডিওকে তিনি বলেন, ওই এলাকায় যাত্রী ওঠানামার জন্য কোনো স্টপেজ নেই। রেল চলাচল সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং ট্রেনেও রেললাইনের অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা হয়। লাইনে অন্য কোনো ট্রেনের মতো বাধা থাকলে ট্রেনটির থেমে যাওয়ার কথা।

‘আমি যা দেখেছি, তা ছিল ভয়াবহ’

দুর্ঘটনাকবলিত একটি ট্রেনের পেছনের দিকের বগিতে থাকা এক যাত্রী এল পাইসকে বলেন, যাত্রার প্রায় ৪০ মিনিট পর তিনি একটি ‘প্রচণ্ড ধাক্কা’ অনুভব করেন। তোলেদো অঞ্চলের মোরা, অর্গাজ ও উর্দা শহরের মধ্যবর্তী রেলপথের ১১৮ কিলোমিটার চিহ্নের কাছে সংঘর্ষটি ঘটে।

দুর্ঘটনায় জড়িত রেনফে ট্রেনটি লাইনে চলাচলজনিত সমস্যার কারণে কয়েক মিনিট আগেই থেমে গতি কমিয়েছিল।

প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ দুর্ঘটনার পেছনে মানবিক ভুল থাকতে পারে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর ওই এলাকায় প্রায় আটটি ট্রেন থেমে গিয়েছিল। পরে সেগুলোকে আবার চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ইরিও ট্রেনটি চলতে পারেনি এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে।

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন থেকে নেমে আসা আরেক যাত্রী মিগেল আঞ্জেল পেরেজ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিইকে ফোনে বলেন, দুর্ঘটনাটি ছিল ‘ভয়াবহ, ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়’।

তিনি রেনফের আভে ২০৮০ ট্রেনের শেষ বগিতে ভ্রমণ করছিলেন। ট্রেনটিতে মোট ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন।

পেরেজ বলেন, “আমরা বুঝতে পারছি, ঘটনাটি কতটা ভয়াবহ।” তিনি আরও বলেন, “প্রচণ্ড ধাক্কা ও ঝাঁকুনির মধ্যে আমরা আসন আঁকড়ে ধরে ছিলাম।”

জানালা ভেঙে তারা বগি থেকে বের হতে পেরেছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে কর্তৃপক্ষ তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তাকে ফোনে কথা বলা বন্ধ করতে হয়।

বাড়তে পারে হতাহতের সংখ্যা

বুধবার সকালে দুর্ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স ও মরদেহ বহনকারী গাড়ি আসা-যাওয়া করতে থাকে। তখনও সব মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে কয়েক মাইল দূরের কনসুয়েগ্রা এলাকার এক যাজক জানান, তিনি সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। রেললাইনের কাছে দুজনকে তিনি শেষ ধর্মীয় প্রার্থনা ও আশীর্বাদ প্রদান করেন।

এর আগে কখনই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি উল্লেখ করে ওই যাজক বলেন, “আমি সেখানে যা দেখেছি, তা ছিল ভয়াবহ। অনেককে অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। তাদের অধিকাংশই তরুণ।”

প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাদ্রিদের আতচা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের একজন কর্মী ভুল করে রেনফে ট্রেনটিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ ইরিও ট্রেনটি তখনও রেললাইন আটকে রেখেছিল। এর ফলে রেনফে ট্রেনটির সঙ্গে ইরিও ট্রেনের পেছন দিক থেকে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় ট্রেনটির গতি কত ছিল, তা এখনও নির্ধারণ করা যায়নি।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। তবে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কাস্তিয়া-লা মানচা আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্থের পাদিয়া টিভিইকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে নিহতের সংখ্যা ‘নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়বে’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পাদিয়া আরও বলেন, “সামরিক জরুরি ইউনিট (ইউএমই) সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। একইভাবে কাস্তিয়া-লিওন, মাদ্রিদ, আন্দালুসিয়া ও নাভারে অঞ্চলও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। সর্বশেষ নাভারে এ উদ্যোগে যোগ দিয়েছে।”

স্পেনে অতীতের ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা

এ মুহূর্তে হতাহতের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব তথ্য নিশ্চিত করা না গেলেও দুর্ঘটনাটি গত ১৮ জানুয়ারি কর্দোবার আদামুজে দুটি উচ্চগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই দুর্ঘটনাটি ছিল ২০১৩ সালের পর স্পেনে সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা।

২০১৩ সালে মাদ্রিদ থেকে ফেরোলগামী একটি আলভিয়া ট্রেন সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার কাছে আংগ্রোয়িস এলাকায় একটি বাঁক ঘুরতে গিয়ে অতিরিক্ত গতির কারণে লাইনচ্যুত হয়। ওই দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত এবং আরও ১৪৫ জন আহত হয়েছিলেন।

স্পেনের রেলওয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১৯৪৪ সালের ৩ জানুয়ারি লেয়োনের তোরে দেল বিয়েরসোতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটিকে। একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে একটি এক্সপ্রেস ট্রেন, একটি শান্টিং লোকোমোটিভ ও একটি মালবাহী ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। সরকারি হিসাবে এতে ৭৮ জন নিহত হন। তবে ধারণা করা হয়, ফ্রাঙ্কোর শাসনামলে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা গোপন করা হয়েছিল।

এ ছাড়া ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই সেভিয়ার এল কুয়েরভোতে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮৬ জন নিহত এবং ১১২ জন আহত হন। ওই দুর্ঘটনায় কাদিস-সেভিয়া রুটে চলাচলকারী একটি রেলবাসের সঙ্গে মাদ্রিদ থেকে আসা একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষ হয়েছিল।

২০০৬ সালের ৩ জুলাই ভ্যালেন্সিয়া মেট্রোতেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বাঁক ঘোরার সময় অতিরিক্ত গতির কারণে মেট্রোভ্যালেন্সিয়ার একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হলে ৪৩ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হন।

গত ১৮ জানুয়ারি আদামুজের দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত একটি সংগঠনের সদস্যরা জানিয়েছেন, এবার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়াতে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান তারা।

সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হোসে ম্যানুয়েল আগের দুর্ঘটনায় আহত এক নারীর আত্মীয়।

তিনি বলেন, “এখন থেকে তারা যে প্রতিটি পদক্ষেপ নেবেন, তার পরিণতি কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তা তারা এখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না।”